বুধবার, ২১ মার্চ, ২০১২

‘বন্ধু’ ভারতের পানি আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত- মাহমুদুর রহমান

‘বন্ধু’ ভারতের পানি আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত

মাহমুদুর রহমান
দ্বিতীয় পর্ব
বাংলাদেশে যে ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদী ভারত থেকে প্রবেশ করেছে, তার মধ্যে সারি নদী একটি। এই নদীটি মাইনথ্রু (Mainthru) নামে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ে জন্মলাভ করেছে। মাইনথ্রু সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সারি নাম নিয়েছে এবং ছাতকের কাছে সুরমা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এছাড়া গোয়াইনঘাট উপজেলায় গোয়াইন (Goyain) নদীর পানিও সারির সঙ্গে মিশেছে। পাহাড়ি নদী সারি-গোয়াইন মেঘালয় থেকে প্রচুর পাথর, মোটা বালু এবং পলিমাটি বহন করে নিয়ে আসে। নদীতীরবর্তী বিপুলসংখ্যক মানুষ এই নদী থেকে পাথর সংগ্রহ এবং পরিবহনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। সুতরাং, নদীটির বেঁচে থাকা কেবল পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বাংলাদেশের অন্তত কিছু মানুষের সংসার খরচ মেটানোর জন্যও আবশ্যক।
এই মাসেই ভারত সরকার মাইনথ্রু নদীতে ৬৩ মিটার উঁচু বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করে সেখানে একটি জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র উদ্বোধন করেছে। এই বাঁধ নির্মাণ প্রক্রিয়ায় আমার জানা মতে, আন্তর্জাতিক আইনে বাধ্যবাধকতা থাকলেও ভারত সরকার বাংলাদেশের অনুমতি নেয়ার কোনো প্রয়োজনবোধ করেনি। সিলেট অঞ্চলের জনগণ ‘সারি নদী বাঁচাও’ আন্দোলন গড়ে তুললেও ভারতের প্রতি অতিমাত্রায় অনুগত বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অদ্যাবধি কোনো রকম প্রতিবাদ পর্যন্ত জানানো হয়নি। এই বাঁধ নির্মাণের প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ৯ নম্বর ধারা উল্লেখ করা আবশ্যক। সেই ধারায় বলা হয়েছে, ‘Guided by the principles of equity, fairness and no harm to either party, both the governments agree to conclude water sharing Treaties/Agreements with regard to other common rivers.’ অর্থাত্, সমঅধিকার, ন্যায্যতা এবং কোনো পক্ষের জন্য ক্ষতিকারক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করার নীতি অনুসরণ করে, উভয় পক্ষ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে সম্মতি প্রদান করছে। সুতরাং, সারি নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণের আগে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে এই নদীর পানিবণ্টন চুক্তি না করে গঙ্গা-চুক্তির ৯ নম্বর ধারা সুস্পষ্টভাবে ভঙ্গ করেছে। এই চুক্তিবহির্ভূত পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত সরকার সিলেট অঞ্চলের পরিবেশ ও জনগণের জীবনধারণকে আজ যে হুমকির মুখে ফেলেছে, তার জন্য সাম্রাজ্যবাদী ভারতের সেবাদাসের ভূমিকা পালনকারী ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ সরকারও সমভাবে দায়ী। তারা দেশের স্বার্থ বিষয়ে নীরব থেকে ভারতকে বাঁধ নির্মাণ ও গঙ্গা চুক্তি ভঙ্গে উত্সাহিত করেছে।
এবার টিপাইমুখ প্রসঙ্গে আসি। সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারাই উজানে ভারতের মণিপুর রাজ্যের বরাক নদী। ভারত সেই বরাক উপত্যকার টিপাইমুখ নামক স্থানে ৩৯০ মিটার দৈর্ঘ্যের এবং ১৬৩ মিটার উচ্চতার এক অতিকায় বাঁধ (mega-dam) নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। সাম্রাজ্যবাদী ভারতের শাসকশ্রেণী যে জায়গাটিকে এই বাঁধ নির্মাণের জন্য বেছে নিয়েছে, সেটি পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। ১৯৮৮ সালেও এই অঞ্চলে ৬.৬ রিখটার মাত্রার একটি তীব্র ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা রয়েছে যে, মণিপুর অঞ্চলে ৮ কিংবা অধিক রিখটার মাত্রার ভূমিকম্প যে কোনো সময় হওয়া সম্ভব। এমন এক স্থানে অতিকায় বাঁধ নির্মাণ সেই ভূমিকম্প প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। ৮ রিখটার স্কেলের ঊর্ধ্বমাত্রার ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়ায় টিপাইমুখ বাঁধ ভাঙলে মণিপুর ও ঘন বসতিপূর্ণ সিলেট অঞ্চলে যে ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা হবে, তা সুনামি কিংবা পরমাণু বোমা বিস্ফোরণজনিত ক্ষয়ক্ষতিকেও হার মানাবে। অর্থাত্ এই বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর থেকে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে ভয়াবহ এক টাইম বোমার সঙ্গে বসবাস করতে হবে।
এ কারণেই মণিপুরের স্থানীয় অধিবাসীরাও বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। অবশ্য, এসব আন্দোলনকে দিল্লির শাসকশ্রেণী বরাবরের মতোই উপেক্ষা করে চলেছে। তাছাড়া সেই ১৯৪৯ সাল থেকেই বিদ্রোহী মণিপুর ভারতীয় সেনাবাহিনীর পদতলে পিষ্ট একটি রাজ্য মাত্র। এ তো গেল ভূমিকম্পজনিত সর্বনাশের আশঙ্কার কথা। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সঙ্গত কারণেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, একবার টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করা হয়ে গেলে সেখানে কেবল জলবিদ্যুত্ উত্পাদনই করা হবে না, ভবিষ্যতে সময়-সুযোগমত পানি প্রত্যাহার করে পদ্মা অববাহিকার মতো মেঘনা অববাহিকাকেও ধ্বংস করা হবে। সে কারণেই ক্ষমতাসীন মহাজোট এবং ভারত থেকে নিয়মিত মাসোহারাপ্রাপ্ত তথাকথিত সুশীল (?) গোষ্ঠী ব্যতীত বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। জনমতের এই বিরূপতা উপলব্ধি করে বহুরূপী রাজনীতিক, স্বৈরাচারী এরশাদ পর্যন্ত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে সিলেটে লংমার্চের লোক-দেখানো নাটক মঞ্চস্থ করতে বাধ্য হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সোল এজেন্সির দাবিদার সরকারের কর্তাব্যক্তিরা তাদের রাষ্ট্রবিরোধী চরিত্র অনুযায়ী আমাদের মাতৃভূমি ধ্বংসকারী যাবতীয় ভারতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে দেখেও সর্বপ্রকারে লজ্জাহীন দালালি অব্যাহত রেখেছে। টিপাইমুখ বাঁধ প্রসঙ্গে সরকারের মন্ত্রী এবং অন্যান্য নেতার গত তিন বছরের বক্তব্য এবার খানিকটা ঝালিয়ে নেয়া যেতে পারে।
একসময়ের বাণিজ্যমন্ত্রী এবং বর্তমানে বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেছিলেন, টিপাইমুখ বাঁধ হলে নাকি বাংলাদেশের লাভ হবে। আমাদের পানিসম্পদমন্ত্রী, তিস্তাপাড়ের রমেশচন্দ্র সেন বলেছেন, আগে বাঁধ নির্মিত হোক, তারপর বাংলাদেশের ক্ষতি হলে তখন দেখা হবে। পানি প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান তো আর এক কাঠি সরেস। তিনি ভারতের অবস্থান সমর্থন করে বাণী দিয়েছেন, ভারত তাদের নদীতে বাঁধ দিলে আমাদের বলার কী আছে? অর্থাত্ আন্তর্জাতিক নদীর (International/Transboundary river) সংজ্ঞা সম্পর্কে দক্ষিণাঞ্চলের এই অখ্যাত, দেশবিরোধী আওয়ামী রাজনীতিবিদের কোনো ধারণাই নেই। তবু তিনি শেখ হাসিনার প্রিয় পানি প্রতিমন্ত্রী। এদের আচরণদৃষ্টে মনে হয়, আওয়ামী লীগ করলেই বোধহয় ভারতের দালালে রূপান্তরিত হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর দিল্লির পদলেহনকারী বক্তব্য নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে নিজের কাছেই ঘৃণাবোধ হয়। এক-এগারোর সামরিক জান্তার সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত এই বিচিত্র, রহস্যময় ব্যক্তিটি বিগত প্রায় চার বছর ধরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজ অব্যাহতভাবে করে চলেছেন। কাজেই তিনি টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ সমর্থন করে সভা, সেমিনার, টেলিভিশনে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন অথবা পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করেছেন, সেগুলোকে আবর্জনা জ্ঞান করে বিবেচনার বাইরেই রাখলাম।
১৯৯৬ সালের বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী, প্রবীণ রাজনীতিবিদ আবদুর রাজ্জাক মাত্র কিছুদিন আগে মারা গেছেন। মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে কটু কথা বলাটা সৌজন্যের মধ্যে পড়ে না। তবু জনগণকে সঠিক তথ্য জানানোর খাতিরে তার কিছু কর্মকাণ্ডের বিবরণ বাধ্য হয়েই দিতে হচ্ছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আবদুর রাজ্জাক পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে গেছেন। পাঠকের স্মরণে থাকার কথা যে, আবদুর রাজ্জাক একটি সংসদীয় প্রতিনিধি দল নিয়ে ২০০৯ সালে টিপাইমুখ পরিদর্শনের নামে ভারতে আনন্দ সফর করে এসেছিলেন। দিল্লি থেকে দেশে প্রত্যাবর্তন করে ভারত সরকারের পক্ষে তিনি যেভাবে সাফাই গেয়েছিলেন, তাতে দেশের সব দেশপ্রেমিক নাগরিক স্তম্ভিত হয়েছে। বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলনে, সংসদের বক্তৃতায়, টেলিভিশন টকশোতে এবং বিভিন্ন গোলটেবিল বৈঠকে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের পক্ষে মরহুম আবদুর রাজ্জাক রহস্যজনক কারণে রীতিমত ওকালতি করেছেন। দিল্লি থেকে ফিরেই ঢাকা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কাছে যা বলেছিলেন শুধু সেটুকুই ২০০৯ সালের ৫ আগস্টের ‘প্রথম আলো’ পত্রিকা থেকে উদ্ধৃত করছি, ‘সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, টিপাইমুখ প্রকল্পে ভারত এমন কিছু করবে না, যা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতি বা হুমকির কারণ হবে। ভারতীয় দুই মন্ত্রী এ ব্যাপারে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার ভারতে ছয় দিনের সফর শেষে দেশে ফিরে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের তিনি একথা বলেন।
রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, ভারত এমন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে না বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। তিনি বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছে, বিদ্যুতের জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হলে সুরমা ও কুশিয়ারাতে আগে যে পানি আসত, তা আরও বাড়বে।’
মরহুম আবদুর রাজ্জাকের বক্তব্য নিয়ে অধিকতর মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
সর্বশেষ ভারতের সুপ্রিমকোর্ট ৫৪টি অভিন্ন নদী সংযুক্ত করে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের পক্ষে যে রায় ঘোষণা করেছেন তা রীতিমত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। ২০০২ সালে ভারত সরকার সে দেশের আদালতেরই একটি রায়ের প্রেক্ষিতে এই বৃহত্ নদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ি দাবি করেছিলেন, অভিন্ন নদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভারত বন্যা এবং খরার কবল থেকে রক্ষা পাবে। বাংলাদেশের জীবন-জীবিকা ধ্বংসকারী এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী এই প্রকল্পটির পরিকল্পনার কথা ১৯৮০ সালে সর্বপ্রথম প্রকাশ পেলেও ২০০২ সাল পর্যন্ত এটা কেবল আলোচনা ও বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। প্রধান বিচারপতি এস এইচ কাপাদিয়ার (SH Kapadia) নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রদত্ত রায়ে একটি নির্ধারিত সময়ের (Time-bound) মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। রায়ে আরও বলা হয়েছে, ‘We direct the Union of India to forthwith constitute a committee for interlinking of rivers. We direct the committee to implement the project.’ (আমরা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিচ্ছি যে, তারা যেন অনতিবিলম্বে নদী সংযোগ প্রকল্পের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। আমরা কমিটিকেও প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দিচ্ছি)। সুপ্রিমকোর্টের এই রায় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পাদিত গঙ্গার পানি চুক্তির ৯ নম্বর ধারার (লেখার প্রারম্ভে উদ্ধৃত) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কেবল তাই নয়, ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের নজিরবিহীন রায় প্রতিটি আন্তর্জাতিক নদী আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। আমি এই প্রসঙ্গে কেবল Helsinki Agreement এবং UN Convention-এর আলোকে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের রায়ের বিশ্লেষণ করব। এই দুটি ছাড়াও ভাটির দেশের অধিকার রক্ষায় আরও যেসব আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেগুলো লেখার কলেবর সীমিত রাখার লক্ষ্যে আপাতত উল্লেখ করা থেকে বিরত রইলাম।
১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ হেলসিংকিতে আন্তর্জাতিক নদীর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে যে চুক্তি (Agreement) স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেখানে পরিষ্কারভাবে কোনো রাষ্ট্র কর্তৃক একতরফা পানি প্রত্যাহারকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চুক্তিটির নাম ‘Convention on the Protection and the Use of Transboundary Watercourses and International Lakes’। এই চুক্তিতে মোট ২৮টি ধারার মধ্যে আমার আজকের লেখার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ধারাগুলিই কেবল পাঠকের আন্তর্জাতিক আইন-কানুন বোঝার সুবিধার্থে এখানে উদ্ধৃত করছি। পাঠকের ধৈর্যের ওপর অত্যাচার হবে জেনেও বিনীতভাবে তাদের ওই ধারাগুলো মনোযোগের সঙ্গে পড়বার অনুরোধ করছি। আমি মনে করি, একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হলে জনগণের তাদের অধিকার সম্পর্কে অবহিত হওয়া অত্যাবশ্যক।
* 2-1. The parties shall take all appropriate measures to prevent, control and reduce any transboundary impact. (পক্ষগুলো সব রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যাতে আন্তর্জাতিক নদীর ওপর বিরূপ প্রভাব প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ এবং হ্রাস করা যায়।)
* (2-2c) The parties shall in particular take all appropriate measures to ensure that transboundary waters are used in a reasonable and equitable way, taking into particular account their transboundary character, in the case of activities which cause or are likely to cause transboundary impact. (পক্ষগুলো সব রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যাতে যুক্তিসঙ্গতভাবে এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহার নিশ্চিত হয়, বিশেষত আন্তর্জাতিক নদীর চরিত্রের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নদীর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।)* (2-6) The riparian parties shall co-operate on the basis of equality and reciprocity, in particular through bilateral and multilateral agreements, in order to develop harmonized policies, programmes and strategies covering the relevant catchment areas, or parts thereof, aimed at the prevention, control and reduction of transboundary impact and aimed at the protection of environment of transboundary waters or the environment influenced by such waters, including the marine environment. (নদীতীরবর্তী পক্ষগুলো পরস্পরের সঙ্গে ন্যায্যতা ও দেয়া-নেয়ার ভিত্তিতে সহযোগিতা করবে, দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে সমন্বিত নীতিমালা প্রণীত হবে, সংশ্লিষ্ট নদীখাত এলাকা অথবা তার অংশবিশেষে এমন কর্মসূচি অথবা কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যাতে করে আন্তর্জাতিক নদীর ওপর বিরূপ প্রভাব প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাস করা যায় এবং নদীজ পরিবেশসহ আন্তর্জাতিক নদী অঞ্চলের পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্য অর্জিত হয়।)* ৪) The parties shall establish programmes for monitoring the conditions of transboundary waters. (পক্ষগুলো আন্তর্জাতিক নদীর অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করবে)* 9-1. The riparian parties shall on the basis of equality and reciprocity enter into bilateral or multilateral agreements or other arrangements, where these do not yet exist, or adopt existing ones, where necessary to eliminate the contradictions with the basic principles of this convention, in order to define their mutual relations and conduct regarding the prevention, control and reduction of transboundary impact. The riparian parties shall specify the catchment area or parts thereof, subject to co-operation. These agreements or arrangements shall embrace relevant issues covered by this convention, as well as any other issues on which the riparian parties may deem it necessary to co-operate. (অভিন্ন নদীতীরবর্তী রাষ্ট্রগুলো ন্যায্যতা ও পারস্পরিক দেয়া-নেয়ার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন অথবা অন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, যদি বিদ্যমান কোনো ব্যবস্থা না থাকে, অথবা বিদ্যমান ব্যবস্থায় এই কনভেনশনের সঙ্গে কোনো অসঙ্গতি থাকলে প্রয়োজন অনুসারে সেটি দূর করবে, যাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অথবা আচরণ নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নদীর ওপর বিরূপ প্রভাব প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাস করা সম্ভব হয়। রাষ্ট্রগুলো যার যার রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত নদীখাতের এলাকা নির্দিষ্ট করবে। এই চুক্তি অথবা ব্যবস্থা এমনভাবে প্রণয়ন অথবা গ্রহণ করতে হবে, যাতে এই কনভেনশনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় এবং অন্যান্য ইস্যুতেও অভিন্ন নদীর তীরবর্তী রাষ্ট্রগুলো তাদের মধ্যে প্রয়োজন অনুসারে সহযোগিতা করবে।)
কাজেই হেলসিংকি চুক্তির আলোকে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের রায় যে আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এই বিতর্কিত, সংকীর্ণ ও একপাক্ষিক রায়ে আন্তর্জাতিক নদী রক্ষা ও নদীজ পরিবেশ সংরক্ষণ, অভিন্ন নদী তীরবর্তী রাষ্ট্রগুলোর বাধ্যবাধকতা এবং একে অপরের সঙ্গে অবশ্যকরণীয় সহযোগিতার প্রসঙ্গগুলো সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।
(তৃতীয় ও শেষ পর্ব আগামী বুধবার)
ইমেইল : admahmudrahman@gmail.com
সূত্র: আমারদেশ, 21/03/2012

ওরা জাতির পিতাকে সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়েছে- সি রা জু র র হ মা ন

ওরা জাতির পিতাকে সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়েছে

সি রা জু র র হ মা ন
উনি বাংলাদেশে ফিরে প্রথমে হলেন রাষ্ট্রপতি, তারপর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপতি পদে বসিয়ে নিজে হলেন নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী। অন্তত আমি তাতে হতাশ হয়েছিলাম। মুজিব ভাই পাকিস্তান থেকে প্রথমে লন্ডনে এসেছিলেন। পাকিস্তানে তাকে এ ধারণা দেয়া হয়েছিল যে পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানকে ‘অটোনমি‘ (স্বায়ত্তশাসন) দিতে রাজি হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে শুনে তিনি রীতিমত একটা ধাক্কা খেয়েছিলেন।
আমি তাকে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির আনুপূর্বিক বিবরণ দিয়েছিলাম। এটাও তাকে বলেছিলাম, স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠন এবং জনসাধারণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা মেটানো কঠিন হবে। তিনি যদি রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী না হয়ে গান্ধীর মতো একটা অভিভাবকের (হাতে একটা চাবুক রাখার কথাও বলেছিলাম তাকে) ভূমিকা নেন তাহলে ভালো হবে বলেও বলেছিলাম তাকে। মুজিব ভাইকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনতাম। তখন তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়তেন। তারপর আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মসহ তার রাজনৈতিক জীবন এবং স্বল্প কিছুকালের মন্ত্রিত্ব লক্ষ্য করেছি সাংবাদিক হিসেবে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তার বিশেষ ছিল না। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের গোটা রক্তক্ষরা সময় তিনি ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে। দেশে তখন কী ঘটেছে, কে কী করেছে, এসব সম্বন্ধে তার কোনো ধারণাই ছিল না।
আমি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম যাই তার মাসখানেক পরে। আমি দিল্লি হয়ে কলকাতায় যখন পৌঁছি তখন তিনি মনুমেন্ট ময়দানের পাদদেশে বিশাল জনসভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। কলকাতার সাংবাদিক বন্ধুরা বলছিলেন, শেখ মুজিব এসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীকে নির্বাচনী বৈতরণী পার করে দিতে। শুনেছিলাম, ঢাকা থেকে যশোর-খুলনা যাওয়া সুবিধাজনক নয়। তাই ঢাকা যাওয়ার আগেই একখানি ভারতীয় গাড়ি ভাড়া নিয়ে আমি সে দুটো জেলা সফর করি। আমার সঙ্গে আরও ছিলেন ডেনমার্কের ‘ইনফরমেশন‘ পত্রিকার সম্পাদক ও ডেনিশ রেডিওর ভাষ্যকার পল নিলসেন। আমার সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ দেখবেন বলে দু’দিন ধরে তিনি কলকাতায় অপেক্ষা করছিলেন।
বিবিসিতে নিয়মিত খবর পেয়েছি এবং সেসব খবর প্রচার করেছি। তা সত্ত্বেও যশোর এবং খুলনায় ক্ষয়ক্ষতি যা দেখেছি তাতে স্তম্ভিত হয়েছি। বিশেষ করে বেনাপোল থেকে যশোর যাওয়ার রাস্তা যেখানে খুলনা রোডের সঙ্গে মিশেছে, সেখানে ধবধবে সাদা কঙ্কালের স্তূপের দৃশ্য এখনও প্রায়ই আমার মনে পড়ে। ভারতীয় বিমানে ঢাকা যাওয়ার পথে কলকাতার পত্রিকায় বাংলাদেশ বিমানের ট্রেনিং ফ্লাইট বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পড়ে কান্না সামলাতে পারিনি। নিহত পাইলটদের মধ্যে একাধিক আমার পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে ক্যাপ্টেন নাসিরুদ্দিন হায়দার সবুজ কলকাতায় আমার বন্ধু এবং মুকুল ফৌজে সহকর্মী ছিলেন।
তেজগাঁ বিমানবন্দরে নেমে দেখি লোকে লোকারণ্য। অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান পাঁচ-ছয় হাজার লোক নিয়ে আমাকে অভ্যর্থনা করতে এসেছেন। বিবিসিতে চাকরি করি, খবর পড়ি, তারই জন্য মানুষের এত কৃতজ্ঞতা অত্যন্ত গভীরভাবে প্রাণকে স্পর্শ করেছিল। পরদিন সকালে জনদুই বন্ধু এসেছিলেন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে দেখা করতে। একজন অপরিচিত তরুণও এলেন। বললেন, শেখ ফজলুল হক মণির সঙ্গে দেখা করলে আমার উপকার হবে। প্রধানমন্ত্রীর (শেখ মুজিব) সঙ্গে সাক্ষাত্ এবং অন্য কোনো ব্যাপারে সাহায্যের প্রয়োজন হলে তিনি ব্যবস্থা করে দেবেন। তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় জানালাম। বন্ধুরা বললেন, শেখ মুজিবুর রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বকে তার পরিবারের কোনো কোনো সদস্যসহ কিছু লোক অর্থকরী ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
মুজিবকে ওরা ঘিরে রেখেছিল
লন্ডনে হাইকমিশনারের অফিস থেকে ওরা টেলিফোন করে বলেছিলেন, ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় পাইপের তামাক পাওয়া যাচ্ছে না, আমি কিছু তামাক নিয়ে গেলে ভালো হবে। আমি দু’পাউন্ড এরিনমোর তামাক আর ভালো দেখে ডানহিলের একটা পাইপ (তার মৃতদেহের সঙ্গে যে পাইপটা ৩২ নম্বর রোডের বাড়ির সিঁড়িতে পড়েছিল) নিয়ে গিয়েছিলাম। সেগুলো নিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই পুরনো গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বললেন, পরে কখনও অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসতে। আমার বিস্ময়ের কারণ এই ছিল যে, ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার ২০ বছরের বেশি দিনের পরিচয় এবং মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কথা তিনি ভালো করেই জানতেন। তবে আমি জানতাম, মুক্তিযুদ্ধে তিনি পুরোপুরি আমাদের পক্ষে ছিলেন না।
আমি ফিরেই আসছিলাম, কিন্তু অন্য একজন কর্মকর্তা নিরাপত্তা প্রহরীদের আমার পরিচয় দিয়ে এসে বললেন, আপনি সরাসরি চলে যান, দেখি কে আপনার পথ আটকায়। প্রহরীরা স্যালুট করে আমাকে ভেতরে যেতে দিলেন। মুজিব ভাই খুব খুশি হয়েছিলেন। আমাকে ডেকে পাশে বসালেন, কর্মচারীদের বললেন, ‘সিরাজ স্বাধীন বাংলাদেশে এসেছে, ওকে মিষ্টিমুখ করাও, রসগোল্লা খাওয়াও।’ মন্ত্রী কামরুজ্জামান আর তোফায়েল আহমেদ ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে। তাছাড়া চার-পাঁচজন অচেনা লোক, তারা ‘জি হুজুর’ ভঙ্গিতে হাতজোড় করে বসেছিলেন। আমি তামাক আর পাইপ তার হাতে দিলাম। তিনি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সপ্রশংস দৃষ্টিতে পাইপটা দেখলেন। বললেন, ‘আমি ঘুষ খাই না, কিন্তু সিরাজ আমার ভাই, সে পাইপ এনেছে, সেটা আমি খাব।’ এমন সময় কবি জসিম উদ্দিন মনোজ বসুর নেতৃত্বে এক ডজনেরও বেশি কলকাতার লেখককে নিয়ে ঢুকলেন। তারা সবাই লাল ফিতায় বাঁধা নিজেদের বই টেবিলে রাখলেন আর ঝুঁকে প্রধানমন্ত্রীর চরণ স্পর্শ করে তাকে প্রণাম করলেন। আমার খুব খারাপ লেগেছিল বয়োজ্যেষ্ঠ লেখকদের এই হীনমন্যতা দেখে। আমি বিদায় চাইলাম। মুজিব ভাই আমার হাত ধরে বললেন, ‘কাল ভোরে ভোরে আসিস, তোর সঙ্গে অনেক কথা আছে।’
পরদিন তিনি বললেন, মুক্তিযুদ্ধে আমার ভূমিকার কথা তিনি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছে শুনেছেন। আমাকে তিনি পুরস্কৃত করতে চান। আমি বললাম, আমি চাই তার সবচেয়ে প্রিয় পোট্রেট। কামাল লোহানী তখন ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ অধিকর্তা। তিনি গণভবনে হাজির ছিলেন। মুজিব ভাই তার সব ফটো তার কাছে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। আমি বললাম, পরদিন সকালে আমি চাটগাঁ যাচ্ছি, ২২ ফেব্রুয়ারি তার সঙ্গে দেখা করব।
সড়কপথে চট্টগ্রাম
দাউদকান্দিতে বড়সড় একদল তরুণ (তারা দাবি করেছিলেন, তারা মুক্তিযোদ্ধা) সড়কে ব্যারিকেড তৈরি করেছেন। ওখানে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা বাস চাপা পড়ে মারা গেছেন। শেখ মুজিব নিজে এসে বিচার না করলে সে সড়ক দিয়ে কেউ যেতে পারবে না। আমি বিবিসির সিরাজুর রহমান, বিবিসির কাজে চাটগাঁ যাচ্ছি শুনে আমাকে যেতে দিতে রাজি হলো তারা, তবে এ শর্তে যে আমাকে কিছু বলতে হবে। এমন সময় জিপে হাজির হলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল ভানোট। তিনি জানতে চাইলেন, আমি নিরাপদ আছি কিনা। বললাম, আমার নিরাপত্তার কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা হচ্ছে জনপ্রিয়তার। কর্নেল ভানোট ‘বাই বাই’ বলে চাটগাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে একজন আমাদের গাড়িতে চাটগাঁ পর্যন্ত গিয়েছিলেন। আরও কয়েকটা ব্যারিকেড তিনি আমাদের পার করে দিয়েছিলেন, তবে সবখানেই আমাকে ছোটখাটো বক্তৃতা করতে হয়েছিল।
চাটগাঁয় ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির মাঠে বিরাট জনসভাসহ অনেক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে হয়েছে। অনেক ফুলের তোড়া আর মালা পেয়েছিলাম। ফিরতি পথে ভোরে ভোরে বেরিয়ে পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন বন্ধুরা। পথঘাট নিরাপদ নয়, ডাকাতি, গাড়ি ছিনতাই অহরহ হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় নভেম্বরে মা মারা গিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে কাছের এক গ্রামে লুকিয়ে থাকা ভাইরাও তার জানাজায় আসতে পারেননি। বৃদ্ধ বাবা গ্রামের বাড়িতে সম্পূর্ণ একলা। ঠিক করলাম, ফেনী থেকে চৌমুহনী হয়ে আমিশাপাড়ায় আব্বার সঙ্গে দেখা আর আম্মার কবর জিয়ারত করে ঢাকা ফিরব। লাকসামে বড় সেতুটি মুক্তিযোদ্ধারা ভেঙে দিয়েছিল। ফিরতেও হবে আবার ফেনী হয়ে। এদিকে সন্ধ্যার পর ফেরি চলে না। আইডব্লিউটিএ ব্যবস্থা করেছিল যে আমার জন্য দাউদকান্দির ফেরি সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত দেরি করবে। সুতরাং ফেরার চিন্তাও আছে।
শহীদ দিবসের ফুল আর আমার গাড়ি
বাবা-ছেলে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম কিছুক্ষণ। আব্বা খুব শুকিয়ে গিয়েছিলেন। গ্রামের বুয়ার রান্না মোটেই খেতে পারেন না। বুয়াকে বললাম, একটা মুরগি জবাই করে কেটেকুটে দিতে। নিজেই আমি সে মুরগি, কচি লাউয়ের তরকারি আর মসুর ডাল রান্না করলাম। বাবা-ছেলে আর ড্রাইভার একসঙ্গে বসে খেলাম। ততক্ষণে বেলা পড়ে গেছে। আব্বার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার যাত্রা শুরু। ফেনী ঘুরে কুমিল্লার কাছাকাছি যখন এসেছি তখন সন্ধ্যা ৭টা পার হয়ে গেছে। হেডলাইটের আলোয় দেখি দুটি ছেলে রাইফেল উঁচিয়ে পথরোধ করে আছে।
সেদিন ১৯ ফেব্রুয়ারি। ওরা কুমিল্লায় ডিসি সাহেবের বাংলো থেকে শহীদ মিনারের জন্যে ফুল আনতে যাবে, অতএব আমার ভাড়া করা গাড়িটা তাদের দরকার। বললাম, তাতে কোনো সমস্যা নেই, আমিও ডিসি সাহেবকে সালাম দিতে যাব, ওরা আমার সঙ্গে আসতে পারে। আমার প্রস্তাব তাদের মনঃপূত হলো না। ওদের গাড়ির চাবি দিয়ে ড্রাইভার আর আমাকে নেমে যেতে হবে। ড্রাইভার বুদ্ধিমান লোক। বলল, উনি কে জানলে তোমরা এ গাড়ি নেবে না। আমি বিবিসির সিরাজুর রহমান শোনার পর ওদের সুর সম্পূর্ণ বদলে গেল। দাবি করল, ওদের ‘অটোগ্রাফ’ দিতে হবে। হেডলাইটের আলোয় রাইফেলের বাঁটে কাগজ রেখে ওদের অটোগ্রাফ দিলাম। ওরা বলল, অন্য কারও গাড়ি নেবে তারা।
২২ তারিখ সকালে গেলাম পুরনো গণভবনে। মুজিব ভাই কিছুটা বিদ্রূপের সুরেই বললেন, আমার তো ধারণা ছিল বাংলাদেশে ফুলের মালা শেখ মুজিবুর রহমানই পান। আমি বললাম, বড় ভাইয়ের গৌরবের ছিটেফোঁটা তো ছোট ভাইদের গায়েও লাগে। উনি বরাবরের মতো পাশে বসতে বললেন। বললেন, দেশে কি আর ফিরবি না? আমি বললাম, ফিরব না কেন, অবশ্যই ফিরব। তিনি জানতে চাইলেন, দেশে এসে কী করবি? এবারে বিদ্রূপের পালা আমার। বললাম, এসে আপনার অফিসের বাইরে ফুলের দোকান করব। আর আপনার কর্মচারীদের ঘুষ দেব। ফুলের মালা আপনার কাছে আসবে আর পেছন দরজা দিয়ে আমার কাছে ফিরে ফিরে যাবে; ব্যবসায় ভালো হবে, কী বলেন? এবারে হো-হো করে হাসলেন মুজিব ভাই।
একজন কর্মচারী এক স্তূপ ফটো এনে রাখলেন তার সামনের কফি টেবিলের ওপর। মুজিব ভাই তার নিজের ছবিগুলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছিলেন। বললেন, ছবিগুলো তোর ভাবীর কাছে নিয়ে যা, তাকেই বলিস একটা ছবি পছন্দ করে দিতে। আমি বললাম, সেটা তার পছন্দ হবে, আমি চাই আপনার পছন্দের ছবি। একসময় লক্ষ্য করলাম, একটা ছবি তিনি দেখছেন বারবার করে। পকেট থেকে কলম বের করে তার হাতে দিলাম। বললাম, লিখে দিন যে এ ছবিটা আপনি আমাকে দিলেন। আর জনসংযোগ বিভাগকে বলে দেবেন, এ ছবি যেন আর কোথাও ব্যবহার না করা হয়। তিনি ছবির নিচের দিকের ডান কোণে লিখলেন, ‘স্নেহের সিরাজকে, তোমার মুজিব ভাই, ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২।’ আমি বললাম, পরশু লন্ডনে ফিরে যাচ্ছি, মুজিব ভাই। তিনি বললেন, বিদেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের যেসব প্রস্তাব আবু সাঈদ চৌধুরীকে দিয়েছিলি সেগুলো লিখে তার কাছে দিয়ে যাস। আমি বিদায় নিয়ে চলে এলাম।
নতুন স্বাধীন দেশের কিছু আলামত
পুরনো এত কথা লেখার কয়েকটা উদ্দেশ্য আছে। একটা হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের পাঠকদের স্বাধীন বাংলাদেশের গোড়ার দিকের একটা খণ্ডচিত্র দেয়া। দেশ তখনও ভারতীয় সেনাদের দখলে। আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিল না। পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম, এমন কিছু লোক প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে আছে যারা চায়নি যে, কেউ তাকে সুপরামর্শ দিক। তারা স্তব-স্তুতি আর ফুলের মালা দিয়ে তাকে সম্মোহিত করে রেখেছিল এবং সেই অবসরে তারা পুরোদমে লুটপাট করেছে। দুর্নীতি প্রধানমন্ত্রীর নিজের পরিবারেও ঢুকে পড়েছিল।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে দেখে এসেছিলাম, নবগঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জওয়ানরা রবারের স্যান্ডেল পরে কুচকাওয়াজ করছে। ঢাকায় এসে দেখি ভারতীয় সেনাবাহিনীর জিপে চড়ে আর সে বাহিনীর উর্দি পরে রক্ষী বাহিনীর লোকেরা ঢাকার রাস্তায় হাওয়া খাচ্ছে। তখন শুনেছিলাম, রক্ষী বাহিনীর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন তোফায়েল আহমেদ এবং ভারতীয়দের গড়ে দেয়া মুজিব বাহিনীর অধিনায়করা (শেখ ফজলুল হক মণি, শেখ কামাল, আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ)। মুজিবের যারা সমালোচনা করছিল রক্ষী বাহিনী তাদের ধরে নিয়ে গেছে, তারপর আর তাদের কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়নি। পরের বছরের ৭ মার্চ মধ্যমেয়াদে সংসদ নির্বাচন দিলেন মুজিব ভাই। উদ্দেশ্য ছিল, একদলীয় আওয়ামী লীগ সংসদ প্রতিষ্ঠা করা। সে নির্বাচন দেখতে গিয়েছিলাম। তার সঙ্গে হেলিকপ্টারে চড়ে দুটো জনসভায় গিয়েছি। সে নির্বাচনে অসাধুতা আর বলপ্রয়োগে আওয়ামী লীগের আসন দখলের খবর পরিবেশন করেছি। বাংলাদেশের অভাবনীয় অর্থনৈতিক সঙ্কট, দুর্ভিক্ষে ৭০ হাজার মৃত্যু আর রক্ষী বাহিনীর ৪০ হাজার মানুষ হত্যার খবর নিয়মিত পরিবেশন করেছি।
বাংলাদেশের মানুষ তখন রণক্লান্ত। তারা মুখ বুজে সবকিছু সহ্য করেছে, কিন্তু গণতন্ত্রকে হত্যা করে মুজিবের আজীবন রাষ্ট্রপতি হওয়া সহ্য করতে তারা রাজি ছিল না। আমার কোনো সন্দেহ নেই, মুজিব ভাইকে সম্মোহিত আর নিষ্ক্রিয় রেখে যারা লুটপাট চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিল তাদের পরামর্শেই এসব অপকর্ম তিনি করেছিলেন। কিন্তু ততদিনে জাতির সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনাগুলো জনকয়েক সেনা অফিসার ঘটালেও তাদের বিদ্রোহের পেছনে জাতির সম্মতি ছিল।
শেখ মুজিবুর রহমান ফেরেশতা ছিলেন না, কিন্তু তার অনেক সদ্গুণ ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা হিসেবে তিনি অবশ্যই জাতির পিতা ছিলেন। তিনি উপমহাদেশের হানাহানি আর বিবাদের অবসান করতে চেয়েছিলেন। কট্টর যুদ্ধাপরাধী বলে শনাক্ত করা ১৯৫ পাকিস্তানি সৈন্যকে মুক্তি দিতে তিনি সেজন্যই রাজি হয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী ও ভুট্টোর সঙ্গে শিমলা চুক্তি করেছিলেন, স্বয়ং লাহোর সফর করেছেন তিনি। স্বদেশেও তিনি সামাজিক শান্তি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। সেজন্য যারা স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল তাদের জন্য তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।
প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসা
স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালে দেশে মোটামুটি সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত মুজিবের মেয়ে শেখ হাসিনা প্রায় ছয় বছর দিল্লিতে গোয়েন্দা বাহিনী র’-এর হেফাজতে থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন ঘৃণা আর প্রতিহিংসার বাসনা নিয়ে। তার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের ১৩ দিনের মাথায় রাষ্ট্রপতি জিয়া এক গভীর ষড়যন্ত্রে নিহত হন, যে ষড়যন্ত্রের কোনো সুরাহা আজও হয়নি। জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন দিয়েছেন শেখ হাসিনা, ওই স্বৈরতন্ত্রকে ৯ বছর স্থায়ী হতে সাহায্য করেছেন।
নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে হাসিনা দু’বার ক্ষমতা পেয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। জাতির দুর্ভাগ্য, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্বক্ষণ তিনি প্রতিহিংসার মন্ত্র প্রচার করেছেন, জাতীয় ঐক্য ও সংহতি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। বর্তমান দফায় ক্ষমতা পেয়ে তিনি ‘বিচার বিচার’ স্লোগান তুলেছেন। কিন্তু কার বিচার, কিসের বিচার? তার দুই দফা প্রধানমন্ত্রিত্বকালে যে হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছে, হাজার হাজার নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে, তাদের বিচার? সাংবাদিক হত্যার বিচার? রুনি ও সাগরের হত্যার বিচার? মোটেই নয়। চার দশক আগে কী ঘটেছিল অথবা ঘটেছিল বলে কল্পনা করা হচ্ছিল, সেসবের বিচারের নামে তিনি আবার বাংলাদেশের আকাশ-বাতাসকে ঘৃণার ধোঁয়ায় বিষাক্ত করে দিয়েছেন। যারা তাঁর সমালোচনা করে তাদের সবাইকে যুদ্ধাপরাধী অপবাদ দিয়ে জেলে পোরা হচ্ছে। গদি রক্ষার জন্য তিনি জাতির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক সম্পদকে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছেন।
বাংলাদেশী জাতি অতীতকে ভুলে যেতে চেয়েছিল, মুজিবকে তারা জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা সমাহিত অতীতকে শান্তিতে থাকতে দেননি। কী প্রয়োজন ছিল অযথা মুজিবকে স্বাধীনতার ঘোষক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ইত্যাদি মিথ্যা খেতাব দেয়ার? শেখ হাসিনা মনে করেন, তার বাবা (এবং হয়তো তিনি স্বয়ং) ছাড়া বাংলাদেশে আর কারও কোনো অবদান নেই। শহীদ জিয়াউর রহমান ও তার পরিবারকে তিনি অশ্রাব্য গালাগাল করেন, জিয়ার পরিবারকে হয়রানি করার কোনো চেষ্টারই তিনি ত্রুটি রাখেন না।
একথা শেখ হাসিনা একবারও কি ভাবেন না যে, ঢিলটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়? জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে তার অবিরাম গীবতের কারণে অনেকেই এখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার ও তার বাবার ভুল-ত্রুটি অন্যায়-অবিচারের ঘটনাগুলো খুঁড়ে বের করতে বাধ্য হচ্ছেন। হাসিনা নিজের মানসম্মান নিয়ে চিন্তিত কিনা জানি না, কিন্তু জাতির পিতার স্মৃতিকে নতুন করে অবমানিত করার, তার ভাবমূর্তিকে নতুন করে হত্যা করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
মুজিব ভাইয়ের জন্মদিনে, মৃত্যুদিনে তার কথা ভাবি। কিন্তু আর কোনো লেখকের মতো স্তব-স্তুতি-ভারাক্রান্ত মিথ্যা লিখতে ইচ্ছা করে না। তখন মনে পড়ে যায়, সত্তরের দশকে যারা তাকে স্তব-স্তুতি দিয়ে ভুলিয়ে রেখে তার ও জাতির সর্বনাশ করেছিল তাদের কথা। শেখ হাসিনা অতীত থেকে শিক্ষা নেননি। বরং অতীতের ভুল-ত্রুটিগুলোর অনুকরণ করতে চাইছেন তিনি। তার বাকশালী মনোভাব বাংলাদেশকে কোনো কল্যাণ দিতে পারবে না, যেমন পারেনি পঁচাত্তরের বাকশাল। (লন্ডন, ১৯.০৩.১২)
serajurrahman@btinternet.com
সূত্র: আমারদেশ, 21/03/2012